ঢাকা, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৯শে রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বেকারত্ব

২৪ ঘন্টা খবর বিডি

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশিত: ১২:২৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২০
শেয়ার করুনঃ

করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এমএসএমই) যে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে তার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক সাম্প্রতিক জরিপে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বলছে করোনাকালে এমএসএমই খাতে বেকারত্বের শিকার হয়েছেন বা কাজ হারিয়েছেন ৩৭ শতাংশ স্থায়ী বা অস্থায়ী কর্মী। আর করোনার প্রাদুর্ভাবে এ খাতে বিক্রি কমেছে ৯৪ শতাংশ। সংগত কারণেই এই গবেষণার ফলকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া জরুরি।

দেশের অর্থনীতিতে এমএসএমই খাতের অবদান অনুধাবন করা যেতে পারে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) আরেক সাম্প্রতিক জরিপ থেকে। বিআইডিএস-এর জরিপ বলছে দেশের এমএসএমই খাতে সব মিলিয়ে ১৩ লাখ ইউনিট রয়েছে। আর শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৮৬ শতাংশই এই খাতে। এই খাত মাসে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করে, মজুরি দেয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে এই খাতের মাত্র ৩৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণ পায়। অথচ দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে এমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শিল্প খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি এবং পরোক্ষভাবে আরও ১ কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।
‘বাংলাদেশের এমএসএমই খাত : করোনায় বেকার হয়েছেন এক-তৃতীয়াংশ কর্মী’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দেশ রূপান্তরে বুধবার আইএফসি’র জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। আইএফসির এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বলছে, করোনাকালে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে দেশের এমএসএমই খাতে বেকার হয়েছেন ৩৭ শতাংশ স্থায়ী বা অস্থায়ী কর্মী।

এ সময় করোনার প্রাদুর্ভাবে এ খাতে বিক্রি কমেছে ৯৪ শতাংশ। এই খাতের ৫০০ প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত জরিপটিতে দেখা গেছে, কর্মীদের ৭০ শতাংশ এখনো অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে বন্ধ বা আংশিকভাবে চালু রয়েছে। জরিপ চলাকালীন দেখা গেছে, গড়ে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মাত্র ১০০ দিনের খরচ বহনের পুঁজি ছিল। চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে বাংলাদেশে ‘কভিড-১৯ বিজনেস পালস সার্ভে’ শীর্ষক সমীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়। আইএফসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে বাংলাদেশের ৯১ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বা তারল্য প্রবাহ সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে প্রায় একই আকারের অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার ব্যবসায়ীদের নগদ প্রবাহ কমেছে যথাক্রমে ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। সমীক্ষায় বাংলাদেশে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী ও পুরুষ উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি বহনের তুলনামূলক চিত্রও উঠে আসে। দেখা যাচ্ছে, এই খাতে নারীদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ৩৭ শতাংশেরই ব্যবসা কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে পুরুষদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২১ শতাংশের ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের সংকট সমাধানে বিশেষ বিবেচনা জরুরি।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। এ খাতের উদ্যোক্তাদের আয় ও সঞ্চয় সীমিত হওয়ায় যেকোনো অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও কম। লক্ষ করা দরকার এই খাতের উদ্যোক্তা এবং তাদের সঙ্গে যেসব শ্রমিক-কর্মচারী, ডিজাইনার শিল্পী কাজ করেন তাদের সবার আয় নির্ভর করে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির ওপর। কিন্তু এবার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পণ্য বিক্রির সবচেয়ে বড় মৌসুম পহেলা বৈশাখে যেমন কোনো উৎসব হয়নি তেমনি রমজান ও কোরবানির ঈদের মৌসুমেও বেচা-বিক্রি ছিল সীমিত। একদিকে বিক্রি নেই আরেকদিকে দোকানপাট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে লাখ লাখ উদ্যোক্তা ও শ্রমিকের জীবন বিপর্যস্ত। আলোচ্য সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আগামী ৬ মাসও পণ্য বিক্রি এবং চাকরিতে নেতিবাচক প্রভাব থাকবে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। আর অদূর ভবিষ্যতে বিক্রি বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না ৭০ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান।

এমতাবস্থায় আসন্ন শীতকালে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রবল আকারে দেখা দিলে এই শিল্প খাতের পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠতে পারে। ফলে দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সরকার ২০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তার বিতরণে আরও মনোযোগী হতে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, উদ্যোক্তারা আগ্রহী হলেও ঋণ বিতরণে তেমন সাড়া দিচ্ছে না ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। যতটুকু ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তা থেকে ক্ষুদ্র ও ছোটরা বঞ্চিতই থাকছে, পাচ্ছেন মাঝারি শ্রেণির উদ্যোক্তারা। এই খাতে ঋণপ্রাপ্তিতে যে সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। এতে কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখে এ খাত পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পথ খুঁজে পাবে। নইলে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে বিকাশের ধারায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে যাবে।