ঢাকা, ২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

সাজেকে- কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বেঁচে থাকা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে পর্যটন।

২৪ ঘন্টা খবর বিডি

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশিত: ৮:৪৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৩, ২০২০
শেয়ার করুনঃ

একসময় জুম চাষ ছাড়া জীবিকা নির্বাহের তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না রাঙামাটি জেলার শেষসীমান্ত সাজেকে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বেঁচে থাকা এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে পর্যটন। এতে অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বদলে গেছে তাদের জীবনধারা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাজেকে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠার আগে জুম চাষ ছাড়া ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এ এলাকার মানুষ। তবে তাদের উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্য অনেক কম দামে বিক্রি করতে হতো। কিন্তু সাজেকের পর্যটন জনপ্রিয় হওয়ার পর এসব পণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে দামও। এতে দিন দিন দোকান-পাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তারা আরও বলছেন, পর্যটন জনপ্রিয় হওয়ার পর অনেকে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের নতুন নতুন মাধ্যম সৃষ্টি হচ্ছে। তরুণরাও পর্যটনকেন্দ্রিক নানা কাজে ঝুঁকছেন। যাদের সামর্থ্য আছে তারা রিসোর্ট দিচ্ছে, জিপগাড়ি বা সিএনজি কিনছেন। আর যাদের সামর্থ্য নেই তারা এসব জায়গায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাজেকে বেসরকারি উদ্যোগে ৮০টির বেশি রিসোর্ট (কটেজ) গড়ে উঠেছে। প্রতিটি রিসোর্টে একজন ম্যানেজর ও ২ থেকে ৪ জন পর্যন্ত কর্মচারী কাজ করছেন। ৩৫টি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এসব রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার, কর্মচারী, বাবুর্চি মিলিয়ে ৬ থেকে ১০ জন কাজ করছেন। এখনো অনেক কটেজ রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। যেখানে কাজ করছেন অসংখ্য মিস্ত্রি। শুধু এই রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টের মাধ্যমে হাজার খানেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর রাস্তার পাশে বিভিন্ন স্পটে অনেক ভাসমান খাবার

দোকান বসে। খাবার তৈরির কাজে মহিলা ও মেয়েদের বেশি দেখা যায়। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে ব্যাম্বু ফ্রাই, ব্যাম্বু টি (চা) ও সামুদ্রিক মাছ ভাজা বেশ জনপ্রিয়। তাছাড়া নানা ধরনের তৈরি খাবারসহ ফলমূল বিক্রি করেন তারা।

সাজেকের সবচেয়ে বড় সমস্যা পানি। রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টগুলোতে ব্যবহারের জন্য পানি নিয়ে আসতে হয় ঝর্ণা থেকে। চান্দের গাড়িতে করে ১ হাজার ৫০০ লিটার পানি আনা যায়। এই পানি বিক্রি হয় ১ হাজার টাকায়। ঝর্ণা থেকে পানি নিয়ে আসার কাজ করে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করছেন।

সাজেক ভ্যালির মূল পয়েন্টে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বসে ছোট বাজার। যেখানে পাহাড়ে উৎপাদিত নানা শাকসবজি ও ফলমূল ছাড়াও নানা ধরনের চাল বিক্রি করেন মহিলারা। পর্যটকদের কাছে এসব পণ্য বেশ ভালো দামে বিক্রি করছেন তারা।

পর্যটকদের সমতল থেকে পাহাড়ে নিয়ে আসতে পাঁচ শতাধিক গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়ির মধ্যে চান্দের গাড়ি (জিপ), পিকআপ ও সিএনজি রয়েছে। যেগুলো প্রতিদিন পর্যটকদের বাঘাইছড়ি থেকে সাজেক ভ্যালিতে নিয়ে আসেন। এতে গাড়ির মালিক ছাড়াও চালক ও হেল্পারের জীবিকার সংস্থান হয়েছে। তাছাড়া অনেকে মোটরসাইকেলে করে পর্যটকদের পৌঁছে দিচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

তাছাড়া বাঘাইহাট থেকে সাজেক ভ্যালিতে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় যাত্রাবিরতি দিতে হয়। এসব রাস্তার পাশে ছোট বাজার ও দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান বেশিরভাগই নারীরা পরিচালনা করেন। এর বাইরে পুরো রাস্তাজুড়ে ঝুড়িতে করে নানা ফলমূল বিক্রি করে পাহাড়ি ছেলেমেয়েরা। রাস্তার পাশে গাড়ি থামতেই পর্যটকদের কাছে ফলের ঝুড়ি নিয়ে ছুটে যান তারা। বিশেষ করে আখ, পেঁপে, কলা, কমলা, মালটা সুলভ মূল্যে বিক্রি করেন তারা।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শীতকালে বেশি পর্যটক এলেও সারা বছরই তাদের আনাগোনা থাকে সাজেকে। অন্যান্য দিনের তুলনায় শুক্রবার বেশি ভিড় থাকে। এ দিন কোনো রিসোর্টে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। অনেক মানুষ জিপ গাড়িতেও (চান্দের গাড়ি) রাত কাটান। সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এ এলাকাকে আরও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে পারলে বিশ্ব পর্যটনের বাজারে জায়গা করে নিতে পারে সাজেক। পাহাড়ি সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সময়োপযোগী প্রকল্প গ্রহণ করলে স্থানীয়দের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণ করারও সুযোগ রয়েছে।

এসব বিষয়ে আলাপকালে সাজেক রিসোর্ট মালিকদের সংগঠনের সভাপতি খুশিরাম ত্রিপুরা বলেন, এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় অনেকে ভাগ্য বদলেছে। যাদের একটু জমি আছে তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চুক্তি করে রিসোর্ট গড়ে তুলছেন। অনেকেই কাজ পেয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আরও একটু জোর দিলে এই এলাকার মানুষ আরও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারবে বলে জানান তিনি।

এসব বিষয়ে কথা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের সাথে। আলাপকালে তিনি বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের জীবন মান উন্নয়নে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বিনামূল্যে সোলার প্যানেল বিরতণ করা হবে। সৌরবিদু্যতের আলোতে পাহাড়ি গ্রামগুলো আলোকিত হয়ে উঠবে। এতে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সহজ হবে। পাহাড়ের মানুষের জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন এলাকায় সরকারের পক্ষ মিশ্র ফল বাগান প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।