ঢাকা, ২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

সরকারি হিসাবে করোনাকালে বাল্যবিবাহ বেড়েছে

২৪ ঘন্টা খবর বিডি

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশিত: ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০২০
শেয়ার করুনঃ

নাজনীন আখতার

করোনাকালের শুরুতে সংক্রমণ রোধ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা যখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছিল, তখন বেসরকারি সংগঠনগুলো বাল্যবিবাহ বাড়ছে জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ওই সময় বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি নিয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য জানা যায়নি। এই অবস্থায় জাতীয় সংসদের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি তথ্য চাইলে মন্ত্রণালয় করোনাকালে কিছু জেলায় বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে জানিয়ে চার মাসের তথ্য উপস্থাপন করেছে।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী রওশন আক্তার করোনাকালে বাল্যবিবাহের তথ্য তুলে ধরে বলেন, নরসিংদী, নাটোর, কুড়িগ্রাম, যশোর, কুষ্টিয়া ও ঝালকাঠি জেলায় বাল্যবিবাহের হার কিছুটা বেড়েছে। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের ৬৪ জেলায় মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসে ২৩১টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৫৮টি বাল্যবিবাহ হয়েছে। মন্ত্রণালয় করোনার আগের মাস হিসেবে শুধু ফেব্রুয়ারির তথ্য তুলে ধরেছে। ফেব্রুয়ারিতে বাল্যবিবাহ হয়েছিল ৬টি।

সরকারিভাবে বাল্যবিবাহের সব হিসাব থাকে না। তাই আগের বছরের সঙ্গে তুলনা করার জন্য বেসরকারি সংগঠনগুলোর তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব অনুসারে, ২০১৯ সালের মার্চ থেকে জুন মাসে বাল্যবিবাহ হয়েছিল ৩৮টি। এই হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ বছরের এই চার মাসে বাল্যবিবাহ বেড়েছে ছয় গুণের বেশি।

সরকারি হিসাবে বাল্যবিবাহের যে পরিমাণ দেখানো হয়েছে, বেসরকারি সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা তাকে অস্বাভাবিক কম বলে উল্লেখ করেছে। তাঁদের মতে, যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তার তুলনায় করোনাকালে বেশি বাল্যবিবাহ হয়েছে।

পরিসংখ্যানে আস্থা–অনাস্থা
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টোরাল প্রকল্প বাল্যবিবাহের বিষয়টিও দেখে। প্রকল্পের পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (বিডিএইচএস) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ থেকে বাল্যবিবাহের প্রবণতার দিকে লক্ষ রাখা হয়। এ ছাড়া সরকারিভাবে বাল্যবিবাহের আলাদা তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। বেসরকারি সংগঠনের কাছেও বাল্যবিবাহের প্রকৃত তথ্য নেই বলে তিনি দাবি করেন।

সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া সরকারি হিসাবে করোনাকালের চার মাসে বাল্যবিবাহ হওয়ার তুলনায় প্রতিরোধ হয়েছে বেশি। এই সময়ে ২৬৬টি বাল্যবিবাহ ঠেকানো গেছে। মামলা হয়েছে ২৩টি। ফেব্রুয়ারি মাসে বাল্যবিবাহ হয়েছে ৬টি এবং প্রতিরোধ হয়েছে ৮৩টি।

বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন করোনাকালে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সহিংসতার তথ্য জানতে টেলিফোনিক জরিপ চালায়। এই সংগঠনের তথ্য অনুসারে মে মাসে ২৭টি জেলায় ১৭০টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। আর ২৩৩টি বাল্যবিবাহ থামিয়েছে তাদের ২৪টি সহযোগী সংগঠন।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক শাহানা হুদা বলেন, বেসরকারি সংস্থাগুলো যা তথ্য পায়, তা–ই তুলে ধরে। কম দেখানোর দায়বদ্ধতা নেই। অন্যদিকে বাল্যবিবাহ বন্ধে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকায় সরকার বিভিন্ন কারণে বাল্যবিবাহের হার কমিয়ে দেখাতে চায়। তাঁর মতে, করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, পাড়া–প্রতিবেশীর প্রভাবে অভিভাবকেরা গোপনে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ত্রাণ ও সংক্রমণের বিস্তার রোধে ব্যস্ত থাকায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তেমনভাবে নজর দিতে পারেনি।

এদিকে বেসরকারি সংগঠনগুলোর তথ্যের ওপর নির্ভর করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি সংগঠনগুলো কোন নিয়ম–নীতির ওপর হিসাব করে বুঝি না। তারা পুরোনো তথ্যও যুক্ত করে। করোনাকালে বাল্যবিবাহ কিছুটা বাড়লেও এখন কমেছে। যেকোনো অর্থনৈতিক সংকটে পরিবারগুলো বাজেট কমাতে চায়। এতে সহজ পদ্ধতি হিসেবে তাঁরা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিতে চায়। করোনাকালের শুরুতে এ প্রবণতা থেকেই অনেক অভিভাবক মেয়েদের গোপনে বিয়ে দিয়েছেন।’

মেহের আফরোজ চুমকির কথার বাস্তব উদাহরণ রাজধানীর রাজারবাগ এলাকার এক খণ্ডকালীন গৃহকর্মী। তিনি জানালেন, এপ্রিল মাসে ১৫ বছর বয়সী বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ‘ভালো পাত্র’ পেয়েছেন বলে বড় মেয়ের দেড় বছরের ছোট মেয়েকেও বিয়ে দেওয়ার জন্য গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।

এক স্কুলেই ২০ বাল্যবিবাহ
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ধানুড়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল ৭১ জন। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয় ৬৩ জন। তবে শেষ পর্যন্ত সেখানে টিকে থাকে ৪৯ ছাত্রী। ঝরে পড়াদের বেশির ভাগ বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে বলে মনে করেন স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর। তিনি বলেন, ‘অভিভাবকদের অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে মেয়েদের বিয়ে ঠেকিয়ে পড়ালেখায় যুক্ত রাখার চেষ্টা করতাম। কিন্তু করোনাকালে সেটা সম্ভব হয়নি। এ সময় কমপক্ষে ২০ মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বেশির ভাগই নবম শ্রেণির। বয়স কম থাকায় অনেক মেয়ের বিয়ের নিবন্ধন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের দুই–তিন মাস পর মেয়েটিকে বাবার বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়।’

গুরুদাসপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তমাল হোসেন বলেন, ‘উপজেলায় বাল্যবিবাহ ও উত্ত্যক্ততা ঠেকানোর জন্য মাইকিং, উঠান বৈঠকসহ ফেসবুকে বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। প্রচার কার্যক্রমে আমার ফোন নম্বর দিয়ে তথ্য দিতে আহ্বান জানিয়েছি সবার কাছে।

করোনাকালে একটি মেয়ে ফোন করে নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকায়। ওই মেয়েটিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। একইভাবে বাল্যবিবাহ পড়ানোর জন্য তিনজন কাজিকে জেল–জরিমানা করা হয়েছে। এভাবে গত ৫ মাসে ৮০টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা গেছে।’

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের উদ্যোগ কম
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুসারে, বিয়ের জন্য মেয়ের বয়স কমপক্ষে ১৮ এবং ছেলের বয়স ২১ বছর হতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত জাতীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি কাজ করবে।

সাতক্ষীরা জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির প্রধান হলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অধিকারকর্মী সাকিবুর রহমান। তাঁর দাবি, জেলায় ৭৫ শতাংশ বাল্যবিবাহ হলেও স্থানীয় প্রশাসনের দু–একজন ছাড়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রশাসন তৎপর নয়।

সাকিবুর রহমান বলেন, বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের কাছে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে করোনাকালে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বাল্যবিবাহ হয়েছে। গত ১০ মাসে কমপক্ষে ৫ হাজার বাল্যবিবাহ হয়েছে। স্থানীয় প্রতিনিধিরা কমিটিতে থাকলেও ভোট কাটা পড়বে বলে বিয়ে ঠেকাতে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারণ অভিভাবকেরা ‘শুভ কাজে বাগড়া’ ধরে নিয়ে মনে অসন্তোষ পুষে রাখেন। তিনি বলেন, ‘গত চার বছরে এক হাজার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছি। একটিতেও স্থানীয় প্রতিনিধিরা যাননি। করোনাকালে অনেক বাল্যবিবাহের খবর প্রশাসনকে দিয়েছি। কিন্তু বিয়ে থামাতে কেউ যাননি।’