ঢাকা, ২৮শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ১৪ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

চরখিদিরপুর : ভাঙছে নদী কাঁদছে মানুষ

২৪ ঘন্টা খবর বিডি

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশিত: ১০:১৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০২০
শেয়ার করুনঃ

হানিফ সংকেত

কেউ কি কল্পনা করতে পারেন, বাংলাদেশে এমন গ্রামও আছে যেখানে মানুষ প্রতি মুহূর্তেই তার আশ্রয়স্থল হারানোর আশঙ্কায় থাকে। যেখানে প্রতিটি সকালেই জন্ম নেয় নতুন খবর। পাল্টে যায় দৃশ্যপট। বদলে যায় মানুষের ঠিকানা।

যেখানে মানুষ যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায় ঠিকানার সন্ধানে। শুধু তাই নয়, যেখানে ভাঙনের ফলে আশঙ্কা দেখা দেয় দেশের মানচিত্র পাল্টে যাওয়ার। সেই গ্রামটির নাম খিদিরপুর। রাজশাহী শহর থেকে দূরত্ব ৬ কিলোমিটার। যেতে হয় পদ্মা পাড়ি দিয়ে। একমাত্র যাতায়াতব্যবস্থা নৌকা। আর ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যেতে লাগে ৪০ মিনিটের মতো।

২৯ অক্টোবরের ইত্যাদিতে এ চরটি নিয়ে আমরা একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছিলাম। সে কারণেই নিজ চোখে দেখেছি এ চরের মানুষের করুণ অবস্থা, দুর্দশার চিত্র। প্রতি মুহূর্তে ঠিকানা হারানোর ভয়। বেঁচে থাকার আকুতি। পদ্মার এপারে রাজশাহী আর ওপারে ভারতের পতাকাবাহী সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবাদ জেলা। আর ওপারের সীমান্ত ঘেঁষেই রয়েছে বাংলাদেশের ছোট্ট এই গ্রাম ‘চরখিদিরপুর’। গ্রামটিকে কেউ কেউ চর খানপুরও বলেন।
নদীমাতৃক দেশ বলেই হয়তো আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদী ভাঙন। এ ভাঙন সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে। সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে এ এলাকার মানুষকে।

স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে সাজানো সংসার। মাঝেমথ্যে দুঃখ এবং কষ্ট এ শব্দ দুটিও যে দুঃখ-কষ্টের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয় তেমনই এক অকল্পনীয় চিত্র দেখেছি এ গ্রামে গিয়ে। দিনের পর দিন এ গ্রামের মানুষের রাত কাটে অনিদ্রায়, এই বুঝি ভাঙল নদী। এই বুঝি নদীতে বিলীন হয়ে গেল তার আশ্রয়ের ছোট্ট ঘরখানা। দু-তিনটি বেড়া বা টিনের চালই যার ঘরের সম্বল। প্রবল স্রোতে এখানে ভাঙছে তীর। যখন স্রোত বাড়ে ভাঙনের গতিও বাড়ে। অপ্রতিরোধ্য সে গতি। সে স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব। এ ভাঙন দুর্যোগে সবচেয়ে সমস্যায় পড়ে শিশু, নারী ও বয়স্করা। এখানকার মানুষ যেন স^প্ন দেখতেই ভুলে গেছে। আজ কোনোভাবে বেঁচে গেলে অপেক্ষা পরের দিনের জন্য।
এ চরের ওপর ‘ইত্যাদি’র প্রতিবেদন ধারণ করার জন্য আমরা ২৬ সেপ্টেম্বর খিদিরপুর যাওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি ঘটে।

তখন উত্তাল পদ্মা। কূলে এসে আছড়ে পড়ছে বিশাল বিশাল ঢেউ। স্থানীয়রা পদ্মার এ অবস্থায় খিদিরপুর যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। যদিও এ ঝুঁকি নিয়েই দিনের পর দিন পদ্মার বুক চিরে খিদিরপুরের মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করছে সেই চরে। যেহেতু আমরা রাজশাহীতে অনুষ্ঠান করব এবং রাজশাহীর এ চরের মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা আগেই শুনেছি তাই যত ঝুঁকিই থাক খিদিরপুর যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হলাম। কিন্তু ২৫ তারিখ রাতে স্থানীয় পবা উপজেলার ভূমি কর্মকর্তা জানালেন ওইদিন সন্ধ্যায়ই পদ্মার টি-বাঁধ এলাকায় অর্থাৎ যেখান থেকে চরের উদ্দেশে যাত্রা হয় এবং নৌভ্রমণকারীরাও যেখান থেকে নৌকায় আরোহণ করেন, সেখানেই একটি নৌকাডুবি হয়েছে ১১ যাত্রীসহ। প্রশাসনের প্রায় সবাই যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টায় ব্যস্ত। রাতে জানা গেল ১১ জনের মধ্যে নয়জনকে উদ্ধার সম্ভব হয়েছে এবং বাকি দুজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার মধ্যে একজন নারী ও একজন পুরুষ। খবরটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। পরে জানলাম দুর্ঘটনাকবলিত নৌকাটিতে বহন ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ওঠে এবং প্রবল স্রোতের কারণে নৌকাটি একটি বিপজ্জনক পানির ঘূর্ণিতে পড়ে যায়, আর সে কারণেই দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার কারণে নৌকায় পদ্মা যাত্রায় কিছুটা ভীত হয়ে পড়লাম। পরে জানতে পারি বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী অর্থাৎ বিজিবির যাতায়াত ও সীমান্তে টহলের জন্য নিজস্ব স্পিডবোট রয়েছে। যা বেশ নিরাপদ। বিজিবির স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ এটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারবে না।

তাই বাধ্য হয়ে সে রাতেই বিজিবি মহাপরিচালক মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা ও সহৃদয় বিবেচনায় অনুমতি পেয়ে আমরা বিজিবির স্পিডবোটে পরদিন সকালে নির্ভয়ে যাত্রা করি চরখিদিরপুরের উদ্দেশে।
স্পিডবোট এগিয়ে চলছে। উত্তাল পদ্মা, তার ওপর বন্যার পানি- সব মিলিয়ে যেন ফুঁসে ওঠে পদ্মা। এ সময় পদ্মার চেহারা অনেকটা সাগরের মতো, এপার-ওপার দেখা যায় না। যেতে যেতে লক্ষ্য করলাম পদ্মার মাঝখানে এক বিশাল চর। এ চরটিকে বলা হয় মধ্যচর। পদ্মার মাঝখানে জেগেছে বলে নাম মধ্যচর। ধীরে ধীরে আমরা এগিয়ে চলছি চরখিদিরপুরের দিকে। স্পিডবোটটি বেশ সতর্কতার সঙ্গে চলছিল। মাঝেমধ্যে কিছু কিছু স্থান দিয়ে একটু ঘুরে যাচ্ছিল। কারণ নদীর ওই স্থানগুলো ভারতীয় সীমান্তে ঢুকে পড়েছে, মুর্শিদাবাদ জেলায়। তবে এসব এলাকার কিছু অংশ একসময় বাংলাদেশেই ছিল কিন্তু ভাঙনের কবলে পড়ে ভারতীয় সীমান্তে ঢুকে গেছে। দূর থেকে দেখে চরটিকে বেশ আঁকাবাঁকা মনে হলো। চরের কোথাও বেশি ভেঙেছে, কোথাও কম। ভাঙতে ভাঙতে কোথাও বেশ ভিতরে ঢুকে গেছে। স্পিডবোটটি কিছুটা দ্রুতগতিসম্পন্ন থাকায় আমরা আধ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাই খিদিরপুর।

স্থানীয় চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বাচ্চু তার কজন সহকর্মী ও গ্রামবাসী নিয়ে আমাদের জন্য তীরে অপেক্ষা করছিলেন। চরে নেমেই কুশল বিনিময়ের পর সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথমেই পুরো চরটা ঘুরে দেখব। তাই এক প্রান্ত থেকে হাঁটা শুরু করলাম। অত্যন্ত ছোট্ট গ্রাম খিদিরপুর। বলা যায় এর তিন দিকেই ভারতীয় সীমান্ত, একদিকে পদ্মা অর্থাৎ এর দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারত এবং পূর্ব-উত্তর কোণেও ভারত। পূর্বে ও উত্তরে বাংলাদেশ। ১৫ বছর আগে এ স্থানের আয়তন ছিল প্রায় ৪ হাজার হেক্টর। এখন মাত্র ৪০ হেক্টর! ভাঙছে পাড় কমছে আয়তন। আগে গ্রাম ছিল তিনটি- তারানগর, খানপুর আর চরখিদিরপুর। আর এখন এ তিনটি গ্রামের দুটি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। অবশিষ্ট আছে খিদিরপুর গ্রামের কিছু অংশ- পশ্চিমপাড়া। অর্থাৎ খিদিরপুর গ্রামটিরও পুরো অংশ এখন নেই। ১৫ বছর আগে এখানকার লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার, এখন আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজারের মতো। এখন গ্রামে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার বাস করে। গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা পদ্মায় মাছ শিকার, কৃষিকাজ ও পশুপালন। তবে ভাঙনের ফলে এখন অধিকাংশ জমিই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় কৃষিজমি তেমন নেই। অথচ একসময় এসব চরের সবজির জন্য রাজশাহী শহরের মানুষ মুখিয়ে থাকত। পদ্মার পলিবিধৌত এসব অঞ্চলে প্রচুর সবজি হতো। যেখানে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হতো না। সে সময় বিষ ও ভেজালমুক্ত এসব সবজি বিক্রি করেও অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করতে। এখন আয়ের সে পথও বন্ধ। এ চরে কোনো চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র নেই। এখানে কেউ অসুস্থ হলে তার জন্য কোনো চিকিৎসাব্যবস্থাও নেই। নেই কোনো চিকিৎসকও। চিকিৎসা কর্মীরাও কালেভদ্রে এখানে আসেন। কেউ অসুস্থ হলে তাকে পদ্মা পার হয়ে যেতে হবে মূল ভূখ- রাজশাহীতে। আর বিদ্যুৎ সংযোগ তো নেই-ই।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটি স্কুলের সামনে এসে পড়লাম। সীমান্ত ঘেঁষে চরের ঠিক মাঝখানে স্কুলটির অবস্থান। পাশেই রয়েছে আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির একমাত্র ক্যাম্প। স‹ুলটির নাম তারানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া গ্রামে আরও দুটি স্কুল রয়েছে- চরখিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। স্কুল থাকলেও আশানুরূপ ছাত্র-ছাত্রী আগেও ছিল না, এখন তো নেই-ই। এর কারণ বাল্যবিয়ে। এটিকে এক অর্থে শতভাগ বাল্যবিয়ের গ্রামও বলা যায়। গ্রামে ঢুকলেই দেখা হয় শিশু মায়েদের সঙ্গে। রীতি অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় এখানে গ্রামের মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়। আর ছেলেরা হয়ে যায় রাখাল। মাঠে গরু চরানোই তাদের কাজ। গ্রামের পথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা বেশ কজন শিশু মায়ের দেখা পাই। গ্রামের এক প্রান্তে একটি বাড়ির সামনে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে একটি শিশু আর তার কোলে আরেকটি শিশু। কথা বলি শিশুটির সঙ্গে। নাম মোসা. সানোয়ারা বেগম। কোলের শিশুটিকে দেখিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে জবাব দিল না। বারবার জিজ্ঞেস করার পর বলল এটি তার সন্তান। অর্থাৎ এক শিশু মায়ের কোলে আর এক শিশু সন্তান! কোলের শিশুটির বয়স আড়াই বছর। জানতে চাইলাম সানোয়ারার বয়স কত? কিছুতেই বয়স বলতে রাজি হলো না। জানাল, তার বিয়ে হয়েছে চার বছর আগে। তখন সে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় সে সময় এই শিশু মায়ের বয়স কত ছিল। এ বয়সে কোলের শিশুটিকে লালনপালন করতে তার কষ্ট হয় কিনা জানতে চাইলেও উত্তর পেলাম না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। জিজ্ঞেস করলাম তার লেখাপড়া করতে ইচ্ছে হয় কি না। নিচের দিকে তাকিয়ে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটছিল। কোনো উত্তর দিল না। কীই বা উত্তর দেবে! কারণ এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তার কাছে। এখানকার রীতিই বাল্যবিয়ে। সুতরাং তার অভিভাবকের ইচ্ছেতেই সে বাল্যবিয়েতে বাধ্য হয়েছে। বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য রাজশাহীর সচেতন সমাজ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে বেশ কবার উদ্যোগ নেয়, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। কারণ শিক্ষার অভাব। শিক্ষিত না হলে এদের বোধোদয় হবে না। বুঝতে পারবে না বাল্যবিয়ে তাদের জন্য কতটা ক্ষতিকর, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।

হাঁটতে হাঁটতে আমি খিদিরপুরের পশ্চিমপাড়ার শেষ প্রান্তে সীমান্তের কাছে চলে আসি। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় রয়েছে বিস্তীর্ণ মাঠ। একদিকে খিদিরপুরের সীমানা, অন্যদিকে ভারতের রানীনগর থানা ও মুর্শিদাবাদ জেলা। আমি যেখানে দাঁড়াই সেখান থেকে এক পা ডানে গেলে ভারত আর এক পা বাঁয়ে এলেই বাংলাদেশ। ওপাশে দেখলাম অনেক গরু-ছাগল চড়ে বেড়াচ্ছে। ওরা বাংলাদেশে থাকে কিন্তু চড়ে বেড়ায় ভারতের মাঠে। খায় সে মাঠের ঘাস। দেশের মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা এত ছোট গ্রাম বোধহয় আর কোথাও নেই। তবে এ এলাকার নদীতীরের বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম ভাঙন। নদীগর্ভে সব হারিয়ে এখানকার মানুষ ছুটছে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে।

হাঁটতে হাঁটতে নদীতীরের মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্দশা দেখে মাঝেমধ্যেই চোখ ভিজে আসছিল। কেউ বা তাকিয়ে আছে পদ্মার অথই পানির উত্তাল ঢেউয়ের দিকে। জানে না তার ভবিষ্যৎ কী। কেউ ঘরের সব আসবাবপত্র, হাঁড়ি-পাতিল গুছিয়ে বস্তাবন্দী করছে। কেউ খুলছে বাড়ির জরাজীর্ণ বেড়া, কেউ বা ঘরের টিনের চাল নিয়ে যাচ্ছে অন্যত্র। সব সময়ই ভয় এই বুঝি পাড় ভাঙল। কোথাও কোথাও শুধু ভিটে পড়ে আছে, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বাড়িঘর। কোথাও সীমান্ত ঘেঁষে কেউ বানাচ্ছে নতুন ঘর। কিন্তু এরপর? সব সময় চিন্তা এবং ভয় গ্রামের অবশিষ্ট মাটিটুকুও যদি বিলীন হয়ে যায়, তাহলে তারা যাবে কোথায়! পাশেই সীমান্ত, দূরত্ব মাত্র ১ কিলোমিটার। সীমান্তের ওপারে তো আর যাওয়া যাবে না। তাহলে উপায়?

কথা বলি নদীভাঙা কজনের সঙ্গে। বৃদ্ধা জমিলা বেগম আমাকে দেখে চিৎকার করে বললেন, ‘ছবি তুলে কী হবে, তোমরা কি আমারে একটা ঠিকানা দিতে পারবা? আমার বাড়িঘর না হইলেও ১০ বার ভাইঙ্গেছে। য়াঁমার থাকার জায়গা নাই। ’ আশপাশের সবার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, ‘এদের নাই, আমাদের নাই, ওদের নাই, তাদের নাই- কারোরই নাই। আমাদের কারোরই থাকার জায়গা নাই। আমরা সবাই খালি ভাইসা বেড়াচ্ছি। ’

২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায় সেদিনের ভাঙন শুরু হয়। তার দাপট চলে রাত ১টা পর্যন্ত। চরের এসব মানুষ ভাঙন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকে। অনেকে সারা রাত ঘুমায় না, জেগে থাকে। এখানে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ নেই। সতর্ক দৃষ্টি- ভয়-ভাঙন কখন হানা দেয় তার দুয়ারে। বৃদ্ধ বশির মিয়া কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, ‘আমাদের কি কেউ মানুষ মনে করে? এর পরে যদি এই নদী ভাঙ্গে আমরা কোথায় যাব? এরপর যদি ভাঙ্গি যায় তাহলে আমাদের গাছতলা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। ’ কোহিনুর বেগম বললেন, সারা রাত খোলা আকাশের নিচে ছিলেন, ঘরের চাল ছিল না। শুধু দুই পাশে বেড়া ছিল। সেই বেড়ার খুঁটির সঙ্গে দুটি সাপ জড়িয়ে ছিল। কেউই জানত না সে সাপের কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠে সাপ দেখে আঁতকে ওঠেন কোহিনুর বেগম। বললেন, একটু আগে সে সাপ দুটোকে সরিয়ে দেন তার স্বামী। জিজ্ঞেস করি, ‘সাপ দেখে ভয় পাননি?’

‘ভয় পাব কেন? ভয়ের মধ্যে থাকতি থাকতি এখন আর কিছুতেই ভয় পাই না বাবা। এই নদী আমাদের সবকিছু নিয়ে গেছে। আমাদের অনেক কষ্ট। ’

নদীভাঙা এ মানুষগুলোর কষ্ট ও দুর্ভোগের শেষ নেই। এদের যাওয়ারও কোনো জায়গা নেই, বসতবাড়ি হারিয়ে কেউ নতুন কোনো চরে অস্থায়ীভাবে থাকে। যখন বর্ষা আসে তখন আবার তারা ঠিকানাহীন হয়ে যায়। স্থানীয় হরিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্ষেপ করে বললেন, ‘বলতে পারেন তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। ’ আর এ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণেই হয়তো ভাঙনের শব্দে এ চরবাসীদের বুক কাঁপে। তার পরও প্রতিনিয়ত এখানে ভাঙছে নদী আর ভাঙনের কবলে পড়ে কাঁদছে মানুষ।

একূল ভেঙে ওকূল গড়া নদীর খেলা হলেও এ ভাঙাগড়ার খেলায় সর্বনাশ নেমে আসে নদীতীরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে। তাই এ আশার পদ্মাও কখনো কখনো সর্বনাশা হয়ে ওঠে তাদের কাছে। যেমনটি হয়েছে খিদিরপুরের পশ্চিমপাড়ার মানুষের জীবনে। এ মুহূর্তে তাদের প্রয়োজন পুনর্বাসন এবং জীবন ধারণের জন্য একটি ঠিকানা।

লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব; পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নকর্মী।