ঢাকা, ২১শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৬ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

রাত তখন অনেক গভীর। পুরো শহর যেন নিঝুম এক পরিবেশে ছেয়ে গেছে। অনেক দুর থেকে একটি পেঁচার শব্দ ভেসে আসছে।

২৪ ঘন্টা খবর বিডি

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশিত: ৭:৩৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০২১
শেয়ার করুনঃ

রাত তখন অনেক গভীর। পুরো শহর যেন নিঝুম এক পরিবেশে ছেয়ে গেছে। অনেক দুর থেকে একটি পেঁচার শব্দ ভেসে আসছে।

এমন এক নিস্তব্দ পরিবেশে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া এক তরুণ ভাবছে তার পরিকল্পনার কথা। একটি স্বপ্নের কথা। বারবার নানান জায়গা থেকে প্রত্যাখাত এই তরুণের মধ্যে কোন হতাশা নেই। সে যেন এক অসীম আত্নবিশ্বাস নিয়ে বুকভরা স্বপ্ন বুনছে।

চীনের ঝি-জিয়াং প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই তরুণটির মা-বাবা ছিলেন পেশাদার গল্পবলিয়ে ও সংগীতশিল্পী। অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়েও মা বাবা ছেলেকে ভর্তি করিয়েছিলেন স্কুলে। কিন্তু স্কুলে ভর্তি করালে কি হবে, ছেলের যে গৎবাধা পড়াশোনায় মন নেই। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া থেকেও সে তখন ইংরেজী শেখার নেশায় বুঁদ। টানা ৯ বছর ধরে প্রায় ৭০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পর্যটকদের এলাকা ঘুরিয়ে দেখাতেন শুধু ইংরেজী শিখবেন বলে। উদ্দেশ্য একটাই, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন করা।

ওই বয়সেই সে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ইংরেজী শেখার বিকল্প নেই। বলছি জায়ান্ট ই-কমার্স কোম্পানী আলীবাবার রুপকার জ্যাক মা’র কথা। জ্যাক’মার এই নামটি অবশ্য জন্মগত ছিলো না। পারিবারিক সুত্রে পাওয়া নাম মা ইউন। পর্যটকদের সাথে কাজ করার সুবাধে একজন পর্যটকের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায় তার। তিনিই তাকে জ্যাক মা নামটি দেন। কারণ চায়না এই নামটি ইংরেজদের জন্য উচ্চারণ করা কঠিন ছিলো।

আলীবাবার আগে জ্যাক মা পুরোদস্তুর একজন ব্যর্থ মানুষ ছিলেন। ব্যর্থতার চরম শিখরে এতোটাই অবস্থান করছিলেন যে কলেজে পাশ করতে জ্যাক মা’র প্রায় ৪ বার পরীক্ষা দিতে হয়েছিলো। ৪বার ফেল করার পর যখন পাশ করে কর্মজীবনে ঢোকা জ্যাক মা ব্যর্থতা যেন হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। টানা ৩০টি চাকরীর আবেদন করে প্রত্যেকটিতেই প্রত্যাখাত হলেন। আমেরিকান এক টকশোতে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে জ্যাক মা বলেছিলেন, আমি যখন পুলিশের জন্য চাকরী করলাম তখন ১০ জনের মধ্যে ৯ জনের চাকরী হলো কিন্তু আমাকে বলা হলো ‘তুমি উপযুক্ত নও’।

আমার শহরে যখন কেএফসি আসলো আমরা ২৪ তখন আবেদন করেছিলাম। ২৩ জনের চাকরী হলো, বাদ পড়লাম শুধু আমি। হার্ভাডে আমি ১০বার আবেদন করেও প্রত্যাখাত হয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিলো ‘হয়তো একদিন আমি হার্ভাডে লেকচার দিব’।

ই-কমার্স বিজনেস শুরু করার আগে জ্যাক মা তার ২৪ বন্ধুকে বাসায় ডাকেন আইডিয়া শেয়ার করার জন্য কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত ২৪ জনের ২৩জনই তার আইডিয়াকে তাচ্ছিল্যের সাথে উড়িয়ে দেন। চার চারবার পরীক্ষায় ফেল, ৩০টিরও বেশী চাকরীতে প্রত্যাখাত সাথে বন্ধুদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য- এরপরও কিন্তু তিনি দমে যাননি। তিনি কম্পিউটার চালাতেও জানতেন না, ইন্টারনেট কি জিনিস তা ভালোভাবে বুঝতেন না কিন্তু তিনি এটা বুঝেছিলেন যে এই জিনিসই একদিন পৃথিবীকে নতুন করে চলতে শেখাবে।

একটি সাক্ষাৎকারে জ্যাক মা বলছিলেন, প্রথম যেদিন আমরা ওয়েবসাইট শুরু করি তখন আমার বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব এবং টিভিসাংবাদিককে দাওয়াত করেছিলাম। খুবই ধীরগতির ইন্টারনেটে ওয়েবসাইটটির অর্ধেক লোড নিতেই প্রায় ৩ ঘন্টা সময় নিয়েছিলো। ওই সময়টায় আমরা খাওয়াদাওয়া ও গল্প করেই কাটিয়েছিলাম কিন্তু আমি খুব গর্বিত ছিলাম। কারণ আমি ওদের কাছে এটা প্রমাণ করতে পেরেছিলাম যে ইন্টারনেট সত্যিই কাজ করে।

আমরা সবাই আলীবাবা ও ৪০ চোরের কাহিনী জানি। ছোটবেলায় যখনও জ্যাক মা’র ব্যাপারে জানতাম না ঠিক তখনোও আমি বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও আলীবাবা ও তার চোরদের কাহিনী পড়েছিলাম। আলীবাবা নামটির নামকরণ করতে গিয়ে জ্যাক মা বলেন, ইন্টারনেট যেহেতু সারাবিশ্বে চলছে সেজন্য আমাদের ওয়েবসাইটের নামও এমন কিছু হওয়া উচিৎ যা সবাই খুব সহজে চিনবে ও জানবে।

সেই সময়ে সার্চ ইঞ্জিন ইয়াহু ছিলো সেরা একটি নাম- আমি এরকম একটি নাম খুঁজছিলাম। একদিন মনে হলো আলীবাবা নামটি ভালো হতে পারে।
সৌভাগ্যই বলতে হবে, চিন্তাটি মাথায় আসার পর তখন আমি এক হোটেলে খাবার খাচ্ছিলাম। ওয়েটার খাবার সার্ভ করতে এলে তাকে বললাম আলীবাবা চেনে কিনা। সে বললো চিনে। আমি বললাম কি? সে বললো- চিচিং ফাক। দারুণ ব্যাপার!

জ্যাক মা’র এসব উদ্যোগকে সেই সময়ে পাগলামো হিসেবে দেখা হচ্ছিলো। এমনকি একটি প্রত্রিকায় তো ‘ক্রেজি জ্যাক’ বা ‘পাগল জ্যাক’ হিসেবেও নামকরণ করেছিলো। এই পাগল জ্যাকই তার সফল উদ্যোগের জন্য মাত্র একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট দিয়েই বর্তমানে প্রায় ৪০ বিলিয়ন সম্পদের মালিক।

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে তরুণ ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য জ্যাক মা সবচেয়ে বড় একটি উপমা হতে পারে। বারবার ব্যর্থতায় গ্রাস করা মানুষটিই পৃথীবীর সবচেয়ে কোম্পানীগুলোর একটি তৈরী করেছিলেন। হার্ভাডে প্রায় ১০ বার প্রত্যাখাত হয়ে নিজের মাকে বলেছিলেন ‘ওখানে পড়ার সুযোগ হয়তো পাইনি কিন্তু একদিন আমি ওখানে লেকচার দিব।’ হয়েছিলোও তাই।

ই-কমার্স ওয়েবসাইট ডেভলপমেন্ট নিয়ে কাজ করার সময় আমরা আমাদের ক্লায়েন্টদের জ্যাক মাকে অনুসরণ করতে বলি। কারণ হতাশ হয়ে বন্ধ করে দিলেই একটি সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতও বন্ধ হয়ে যায়। স্বপ্ন দেখার সময় ব্যর্থ হলে অন্যরা যখন সাহসই হারিয়ে ফেলেন তখন জ্যাক মা ঘুরে দাড়িয়েছেন বারবার। আর এখানেই তার সাথে অন্যদের পার্থক্য। তাই স্বপ্ন দেখুন, লেগে থাকুন। আপনার স্বপ্নের সাথে লেগে থাকলে সফলতা আসবেই।

আপনার অনলাইনের বিজেনেসের যেকোন ধরনের কনসাল্টেন্সি পেতে জানাতে পারেন, বিনা পারিশ্রমিকে সঠিক গাইডলাইন ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট সবসময়ই আপনার পাশে থাকবে।