ঢাকা, ১১ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২৮শে শাবান, ১৪৪২ হিজরি

১৮ই মার্চ, ২০১৯ইং এর দিনটি এবং বাঘাইছড়ি ট্যাজেডীর (স্মৃতিচারন)

২৪ ঘন্টা খবর বিডি

স্টাফ রিপোর্টার


প্রকাশিত: ১০:৪৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০২১
শেয়ার করুনঃ

পিয়াল দত্ত—বিশেষ প্রতিবেদন

জাতীয় নির্বাচনে এই কেন্দ্রে সরকারি দায়িত্ব নিয়েছিলাম বাবা ছেলে, এর কিছুদিন পরেই আবারো বাবা ছেলে নির্বাচনের সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য বাঘাইছড়ি ৫ম উপজেলার নির্বাচনী কেন্দ্র কংলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আমরা পৌছাই ভোটগ্রহনের পুর্বদিন। বিকেলে সবার সাথে ঘুরাঘুরি করে সময় কাটালাম আর বাবা ছিলো রান্না নিয়ে ব্যাস্ত, কারন রাতে সবাই কে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে বাবা। রাতের খাওয়া শেষ করে ডিউটির শিডিউল ঠিক করে দিলো বাবা। মাঝরাতে খুব জোড়ে একটা বাতাস এলো সবার ঘুম ভাঙিয়ে দিলো সবার। আমি বাবাকে ঘুমুতে পাঠিয়ে নিজে ডিউটি করেছিলাম রাত ২.০০ টা পর্যন্ত।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙলো আমার বাবা ডেকে দিয়েছিলো “ও মনা উঠছেনা” এই মনা শব্দটা বাবা আমাকে দিয়েছিলো আমার জন্মের পর পরেই। তো সেদিনও মনা ডাকেই ঘুম ভাঙালো আমার। উঠে ফ্রেস হলাম এবং এরপর বাবা নিজের রান্না করা (নির্বাচনী কেন্দ্রের দায়িত্বরত সবার জন্য) গরম গরম ভাত এবং শুটকির তরকারী দিয়ে খেতে দিলো আমাকে সাথে একটা সেদ্ধ ডিম সহ। খাওয়া সেড়ে সোজা কংলাক পাহাড়ে উঠলাম আমি আর আমার উৎপল কাকা। কেন জানি পরিবেশটা বেশ গুমোট ধরে ছিলো সেদিন। সকালের বাতাস টা বেশ ফুরফুরে ছিলো, হালকা গরম হালকা শীতল ছিলো বাতাস।

কংলাকের চুড়োয় একটা চায়ের দোকান ছিলো , দোকানের মালিক সবে আসলো দোকান খুলতে আমাদের বেশ ইচ্ছে করছিলো চা খেতে। পরে দোকানি চা দিলো। এরপরে নামলাম নীচে, বাবা নির্বাচনী কেন্দ্রের কমান্ডার হিসেবে আদেশ করলো সবাইকে সরকার কতৃক পোষাক পড়ে নিতে অল্প কিছুক্ষন পরে শুরু হবে ভোট, সময় সকাল ৭.৫০ মিনিট, সবাই যে যার মতো পজিশন নিলাম, বাবা আমাকে একটা ছায়াযুক্ত স্থানে দাড় করিয়ে দিলেন, এবং বাবা অবস্থান নিলেন কেন্দ্রের ভেতরে।

শুরু হলো বাঘাইছড়ির ৫ম উপজেলা নির্বাচন এএর ভোট গ্রহনের আনুষ্টানিকতা, পরিবেশ যাচাই করে গেলেন স্থানীয় চেয়ারম্যান মহোদয় “জনাব নেলসন চাকমা” । সন্তোষ প্রকাশ করলেন উনি বাবাকে। এর পর দীর্ঘ লাইন ভোট দিতে আসা উৎসাহী সাজেকবাসীর। টানা ২ ঘন্টা ভোট গ্রহন চললো উৎসবমুখর পরিবেশে। এরপর হঠাৎ করে ভোটারদের লাইন হতে সড়ে যেতে লাগলো ভোটার রা। পরক্ষনে চেয়ারম্যান মহোদয় এর সাথে কয়েকজন ভোটার কেন্দ্রের উপরে এসে বললো উনারা জানতে পেরেছে গতরাতে ভোট চুরি হয়েছে সেজন্য উনারা ভোট দিবেন না। তৎক্ষনাৎ কেন্দ্রে দায়িত্বরত সব অফিসার রা আশ্বাস দিলো কোন প্রকার সমস্যা হয়নি আপরারা এসে ভোট দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। এরপরে সব ঠিকঠাক ভাবে এগোলো বেশ কিছুক্ষন, এরপরে কেন্দ্রের আশেপাশে কেউ নেই। তারপরে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহন করলাম, এই কেন্দ্রে কোন ঝামেলা নাই তাই ভোট গ্রহন চলবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৪.০০ টা পর্যন্ত। এক পর্যায়ে বাবা আমাকে ডেকে বললো তোর বিদেশ দাদাকে কয়েকটা ছবি তুলে দে সরকারি ইউনিফর্ম নিয়ে। আমিও বাবার কথামতো তাই করলাম।

এরপরে দুপুরের খাবার খাইয়ে দিলো বাবা সবাইকে। আমাকে একপাশে নিয়ে বললো তোর মা খুশি হয় মতো বাড়ি গিয়ে সবাই মিলি বিরিয়ানি পার্টি করবো একটা, চা খাবি তুই ? চল চা খাই আমরা বাবা ছেলে। কেন্দ্রের পাশেই চায়ের দোকান ছিলো আমার খালি চা খেলাম। এরপরে দুপুরের খাবার ও একসাথে খেলাম, বাবা তার প্লেট হতে মাংসগুলো আমার প্লেটে তুলে দিচ্ছিলো বার বার। আমি বাবার দিকে তাকাতেই বাবা বলে উঠে “খা মনা খা” তুই খেলে আমি খাইছি। বাবা ছেলে খাওয়া শেষ করলাম এবং ফ্রেস হলাম। এরপর বাবা অস্ত্রটা আমার হাতে দিয়ে কিছু পার্টস এর নাম শেখালো আমাকে, কি করে ফায়ার করতে হয় তার নমুনা দেখালো। বাবার সাথে যোগ দিলো পুলিশ ভাইজান “এনামুল ও সাব্বির”। হঠাৎ একপর্যায়ে প্রিজাইডিং অফিসার শিক্ষক আমির হোসেন স্যার চিল্লাচিল্লি করছে গিয়ে দেখি কেন্দ্রের পানি খরচের টাকা নিয়ে হালকা ঝামেলা হইছে উনাদের মধ্য।। পরে ঝামেলা মিটমাট হলো এবং কেন্দ্র প্রধান নির্দেশ করলো ক্লোজ করতে ভোট গননা হবে একটু পরে।

দরজা জানালা বন্ধ, সবাই ভেতরে প্রবেশ করলো ভোট গননা শুরু হলো। বাবা বের হয়ে এলো এবং আমাকে বললো মনা সব গুছিয়ে নিয়েছিস তো? তুই তো ভালো ছবি তুলিস আমার একটা ছবি তুলে দেনা। শোন তুলা ৫৬ লেখাটা আসে মতো। কারন এই রাইফেল আবার কবে হাতে নিতে পারি তা তো জানিনা।। এরপরে আমি বাবাকে কিছু ছবি তুলে দিলাম ফোনে।

এবার আমাদের যাত্রার সময় কাছে এলো। সবাই ব্যাগ গুছাচ্ছে, আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম বাবা তুমি রাতে কি সদরে থাকবে? বাবা জবাব দিলো হ্যা বাবা রাতে ঘরে ফিরবোনা, নির্বাচনের কারনে কালকে কি পরিবেশ থাকে জানিনা, তুই এই ১০০ টাকা হাতে রাখ, বাইকে ১ লিটার তেল নিয়ে আমাকে নিতে আসবি কাল সকাল বেলা, আমি হ্যা সূচক মাথা নাড়িয়ে বললাম বাবা তুমি রাতে কি পড়বে আমার স্যান্ডেলগুলো নাও রাতে পড়তে পারবে। বাবা বললো দুর অডা ন লাগিবো এক্কানা, পায়ে যেগুলো আছে ওগুলো পরে ঘরে আসবো।।

আমাদের গাড়ি বহর যাত্রা করলো বাঘাইছড়ির দিকে, বাবা আর আমি ছাদের উপর বসলাম ব্যালেট বক্স সাথে নিয়ে। বাবা সাজেক ক্রস করার পর সব পরিচিত মানুষদের গাড়ী হতে হাত দেখাতে লাগলো। ও দা বেড়া যেইয়ো ( ও দাদা বেড়াতে যাবেন) বলে।।

মাচালং এলাম, এবার আরো ১ টা গাড়ি যুক্ত হলো আমাদের সাথে, সবগুলো পরিচিত মুখ। গাড়ী চলছে সাই সাই করে পাহাড়ী রাস্তায় হর্ন বাজিয়ে। এরপরে বাঘাইহাট এসে পৌছালাম, আমার বাইক রাখা ছিলো বাঘাইহাট সেকারনে আমি সহ গাড়ী বহর হতে আমরা প্রায় ৬/৭ জন নেমে গেলাম। বাবা আমাকে বললো মনা ঘরে পৌছে মাত্র ফোন করবি আমাকে পৌছে গেছিস কিনা, আর সরকারি ইউনিফর্ম খুলবি না, কেউ যদি কিছু জিজ্ঞেস করে বলবি সরকারি দায়িত্ব পালন করে বাড়ি ফিরছিস। তুই পৌছে আমাকে ফোন করিস।

এই ছিলো বাবার সাথে আমার শেষ আলাপ,
আমি বাড়ি পৌছে মাত্র বাবাকে ফোন দিলাম, দেখি বাবা ফোন ধরেনা, একবার, দুইবার, তিনবার। হুটকরে আরেকটা ফোন এলো বাবাদের গাড়িতে হামলা হয়েছে শুনলাম, আমি সাথে সাথে বাইক নিয়ে পড়ে গেলাম, কিভাবে শক্তি পেলাম জানিনা, বাইক তুলে সোজা বাসায় গেলাম মা কে জানালাম, মা ছিলো ঠাকুরঘরে। মা আমার মুখে শোনার পরে ঠাকুরের আসনে মাথা বাড়ি খেতে লাগলো। আমি বললাম মা বাবার কিছু হয়নি বাবা জীব